মার্কিন শেয়ারবাজারের সাম্প্রতিক উত্থানে নেতৃত্ব দিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)–নির্ভর প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো। এ পরিস্থিতি বিনিয়োগকারীদের আশাবাদ বাড়ালেও তৈরি হয়েছে নতুন আশঙ্কা। বিশেষ করে বাজারের অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবন, উচ্চমূল্যায়ন ও বিনিয়োগকারীদের আচরণ এ উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি এক জরিপ পরিচালনা করেছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ)। জরিপে উত্তরদাতাদের বড় অংশ বলছেন, মার্কিন এআই-সংক্রান্ত শেয়ারদরে বড় ধরনের পতনের অভিঘাত বিশ্ব অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। খবর আনাদোলু।
বৈশ্বিক শেয়ারবাজারের উত্থানে গত বছর সবচেয়ে অবদান রেখেছে মার্কিন কোম্পানিগুলোর পারফরম্যান্স। বিশেষ করে এআই-নির্ভর কোম্পানিগুলোে এ সময় শক্তিশালী মুনাফা করেছে। ডব্লিউইএফের ‘চিফ ইকোনমিস্টস আউটলুক: জানুয়ারি ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ‘ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন’ প্রযুক্তি জায়ান্ট অ্যাপল, মাইক্রোসফট, অ্যামাজন, অ্যালফাবেট, মেটা, এনভিডিয়া ও টেসলা সম্মিলিত বাজার মূলধনের প্রায় ৩৫ শতাংশ দখল করে আছে, যা ২০২২ সালের নভেম্বরে ছিল ২০ শতাংশ।
একই সময়ে ক্রিপ্টোকারেন্সির মূল্য কমেছে। অনিশ্চয়তা ও নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে চাহিদা বাড়ায় ১৯৭৯ সালের পর সবচেয়ে শক্তিশালী বার্ষিক পারফরম্যান্স দেখিয়েছে স্বর্ণ। এপ্রিলে শুরু হওয়া নিম্নমুখী ধারা কাটিয়ে মার্কিন ডলার অন্যান্য প্রধান মুদ্রার বিপরীতে শক্তিশালী হয়েছে।
গত ১৯ নভেম্বর থেকে ৩ ডিসেম্বর পরিচালিত জরিপটিতে ৫২ শতাংশ উত্তরদাতার ধারণা, চলতি বছরে মার্কিন এআই-সংক্রান্ত শেয়ারদর কমবে। এর মধ্যে ৯ শতাংশ বড় ধরনের পতনের আশঙ্ক্ষা করছেন, আর ৪২ শতাংশ উত্তরদাতা ধারণা এআই-সংক্রান্ত শেয়ারদর আরো বাড়বে। অন্যদিকে ৬৮ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, চীনের এআই-সংক্রান্ত শেয়ারদর ঊর্ধ্বমুখী থাকবে। ৫৯ শতাংশের মতে, ২০২৫ সালে শক্তিশালী পারফরম্যান্সের পর ইউরোপীয় শেয়ারদরও বাড়বে।
অন্যান্য সম্পদের ক্ষেত্রে ৫৪ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, স্বর্ণের দাম ২০২৫ সালেই শীর্ষে পৌঁছেছে। তবে ৪৬ শতাংশ মনে করেন, চলতি বছরে দাম আরো বাড়তে পারে। ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গি তুলনামূলকভাবে নেতিবাচক ছিল। ৬২ শতাংশ উত্তরদাতা এ খাতে আরো লোকসানের আশঙ্কা করছেন। এছাড়া ৫৪ শতাংশ উত্তরদাতার মতে, মার্কিন ডলার দুর্বল হওয়ার ধারা অব্যাহত থাকবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই-সংক্রান্ত শেয়ারের অতিমূল্যায়ন ও বিনিয়োগকারীদের আচরণ মিলে সম্ভাব্য ‘অ্যাসেট বাবল’ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করছে। কয়েক বছরে প্রযুক্তি ও ইন্টারনেট কোম্পানির শেয়ারদরে অতি উচ্চমূল্যায়নের পর দ্রুত পতন ঘটে ২০০০ সালে, যা ডটকম ধস হিসেবে পরিচিত। ওই সময় মার্কিন প্রযুক্তি শেয়ারবাজারে প্রায় ৫ ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়। দেউলিয়া হয়ে পড়ে অনেক বিনিয়োগকারী ও কোম্পানি।
ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্টস (বিআইএস) জানিয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মার্কিন শেয়ার ও স্বর্ণ দুটিই বাবল তৈরির মতো বৈশিষ্ট্য দেখিয়েছে। গত পাঁচ দশকে প্রথমবারের মতো দুটো সম্পদই একই সঙ্গে দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় রয়েছে।
আর্থিক স্থিতিশীলতা বিষয়ক সর্বশেষ পর্যালোচনায় ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংক (ইসিবি) বলেছে, মার্কিন প্রযুক্তি শেয়ারের অত্যধিক উচ্চমূল্য ‘ফিয়ার অব মিসিং আউট’ (এফওএমও) দ্বারা চালিত হচ্ছে। এ প্রবণতা অনুসারে, গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হারানোর আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা অতিরিক্ত তৎপরতা দেখালে বাজারে অযথা উত্থান বা অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। ইসিবি সতর্ক করে বলছে, কোনো প্রতিকূল ঘটনা ঘটলে শেয়ারদরে হঠাৎ বড় পতন হতে পারে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) গত অক্টোবরে গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্টে জানিয়েছে, ‘ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন’কে ঘিরে বাজারে অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবন ঝুঁকি বেড়েছে এবং নেতিবাচক কোনো ঘটনা বৈশ্বিক শেয়ার ও বন্ডবাজারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে ডটকম বুদবুদের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির সরাসরি তুলনার বিরুদ্ধেও যুক্তি দিয়েছে আইএমএফ। তাদের মতে, এআই কোম্পানিগুলো এরই মধ্যে উচ্চমাত্রার মুনাফা করেছে। এতে ভূমিকা রেখেছে আয়ে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি এবং ডেটা সেন্টার ও অবকাঠামোয় বড় অংকের বিনিয়োগ। এছাড়া কোম্পানিগুলোর বাজারমূল্য ও আয়ের অনুপাত এখনো প্রত্যাশিত ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আইএমএফ ও অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বলছে, শুল্কসংক্রান্ত কর্মকাণ্ড বিবেচনায় না নিলেও গত বছর এআই-সংক্রান্ত মূলধনি ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
ডব্লিউইএফের জরিপে অংশ নেয়া ৭৪ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, মার্কিন এআই-সংক্রান্ত কোম্পানিগুলোর শেয়ারদরে বড় ধরনের পতন হলে তার প্রভাব বিশ্বজুড়ে ব্যাপকভাবে অনুভূত হবে। এর বিপরীতে ২৬ শতাংশ মনে করেন, প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকবে।
প্রতিবেদনে আইএমএফের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ গীতা গোপীনাথের বক্তব্যের বরাত দিয়ে বলা হয়, মার্কিন শেয়ারবাজারে বড় ধরনের ধস নামলে ক্ষতির পরিমাণ সর্বোচ্চ ৩৫ ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। ডটকম ধসের মতো বড় মাত্রার পতনে মার্কিন পরিবারগুলোর সম্পদমূল্য কমতে পারে ২০ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। অন্যদিকে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা ১৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।
জরিপে ৬৬ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, মার্কিন ডলারের তীব্র পতনেও বৈশ্বিকভাবে বড় প্রভাব পড়বে। তবে অধিকাংশ অংশগ্রহণকারীর ধারণা, স্বর্ণ, ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং চীন ও ইউরোপের শেয়ারদরের ওঠানামার বৈশ্বিক প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিতই থাকবে।